SITER SWAD শীতের সোয়াদ বাণী বসু

 


শীত কক্ষনও দোলায় চেপে, ঘােড়ায় চেপে, নৌকায় চেপে আসেন না যে চার দিকে মড়কের হাহাকার পড়ে যাবে। ধরণী শস্যশ্যামলা। চার দিকে প্রাচুর্যের হিল্লোল। কবে কোন কালে সব জমিজমা বিক্রি করে শহরে বসত, তবু শহুরিয়ারা তাদের শিকড়ের স্বাদ-গন্ধ ভুলতে পারে না। তাই শহর বাজারেও নতুন ফসলের উৎসব হয় ঘরে ঘরে। নবান্ন। নতুন চালবাটা, আথঝাড়াই, মটরশুটি, মুলাে, কমলালেবু। আর যা যা ফল পাওয়া যায়, অন্তত নরকম। সব নলেন গুড়ে আর কাঁচা দুধে মেখে নবান্ন। পুরাে জিনিসটাই আসলে প্রসাদ। প্রকৃতির প্রসাদ। এক অভিনব ফুট স্যালাডও বটে, নৈবেদ্যও বটে। তবে, নৈবেদ্যটি আমাদেরই ‘পেট্টায়’ হয়ে থাকে।






নবান্নের গন্ধমাখা সেই অঘ্রান গড়াতে থাকে আর বাজার থেকে আসতে থাকে আধােফোটা, কী আঁটসাট ফুলকপি, সবুজে-সাদায় টাইট বাঁধাকপি, ম্যাজেন্টার আভা লাগা সাদা সাদা মুলাে, হালকা সবুজ ওলকপি, সাদা সাদা ফুলতােলা গােছা গােছা পেঁয়াজকলি, ভেতরে টকটকে লাল বাইরে ধূলিবর্ণ বিট, কমলা রঙের নিটোল গাজর, চ্যাপ্টা সবুজ ফ্রেঞ্চ বিন, কালচে সবুজ চওড়া চওড়া শিম। কত বলব? চওড়া পাতার পালং শাক, সাদা ধবধবে দুধমান (কচু), মটরশুটি, টুকটুকে টোম্যাটো। আর, সবার ওপরে সত্য যা, শীতের শ্রেষ্ঠ দান — ননীতাল আলু। ননীর তালের মতােই। আমরা সারা শীত ভরে আলুভাতে, আলুভাজা খেতে ভালবাসতুম।

পটল বেচারিরা পেকে হলদে কটকটে হয়ে বিদায় নিচ্ছে। ঢেঁড়স ছেতরে গেছে, কেউ আর তাদের পুঁছছে না। তেমনই দশা ঝিঙে আর লাউযের৷ চালকুমড়াে, পেঁপে, লাল কুমড়ােরা বারােমেসে৷ তবু এখন তাদের মােটেই কদর নেই। বেগুন সুন্দরীরা সুযােগ বুঝে হাল ফিরিয়ে ফেলেছে। কে বলবে ক’দিন আগেই রােগা, দরকচা, বিচিওলা, কুটকুটে ছিল! এখন তারা মুক্তকেশী, সবুজে- বেগুনিতে মেশামেশি। কিংবা ঘাের বেগুনি, বেশ নধর গিন্নিবান্নি টাইপের। এই বেগুনভাজা মােলাযেম মাখনের মতাে একেবারে। আর, কাঁচা লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে এই বেগুন পুড়িয়ে খেলেও মুখ ছেড়ে যাবে।



এই নতুন শস্যের শুভাগমন কার জন্য? সূর্যের জন্যই তাে প্রধানত। সে ভদ্রলােক তাঁর ভােল্টেজ নরম-গরম না করলে তাে কিছুই হত না! তাই জনগণ, গ্রামে গ্রামে যাঁরা প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করে প্রকৃতির দানের মর্ম বুঝতে পারেন, তাঁরা ইতুপুজো চালু করেছিলেন অঘ্রানের দিনে। পয়লা অম্লান ইতুর ঘট পাতা হবে। একটা বড় সরায় মাটি বিছিয়ে তাতে ধান, কলাই, ছােলা ইত্যাদির বীজ পোঁতাে। তাতে প্রতি দিন একটু একটু করে জল দিতে হবে, ছােট্ট ছােট্ট ইতুর ঘট পাওয়া যায়৷ ক’দিন পরেই, ছােট্ট ছােট্ট কল উঠবে, বাড়তে থাকবে চারা। এই সরা-ঘট ঠাকুরঘরে রাখা থাকবে। অঘ্রানের শেষ দিনে অর্থাৎ সংক্রান্তিতে গঙ্গায় বিসর্জন হবে। ইতিমধ্যে প্রতি রবিবার ইতুর পালুনি।



ভাের ছটা বেজেছে কী বাজেনি। বাসিমুখে বাসি কাপড়ে ইতুর পাঁচালি বলবেন মা, লেপের ভেতর থেকে উকি মেরে শুনব আমরা। উমনাে-ঝুমনাের গপ্পো। ইতুর পালুনি কিন্তু খুব সােজা। রবিবারে রবিবারে নিরামিষ ভাতেভাত খেতে হবে। নতুন চালের চমৎকার সুগন্ধি ভাত, তাতে গাওয়া ঘি পড়বে৷ আর, আলু, কপি কড়াইশুটি ভাতে, কাঁচকলা ভাতে, মুলােভাতে, এবং মটরডাল ভাতে। মটরডাল এক রাত ভিজিয়ে রেখে বেশ আঁট-আঁট করে বেটে নিতে হবে। উনুনে জল চড়িয়ে দিন। জলটা যখন টগবগ করে ফুটবে, তখন মটরডালবাটা গােল্লা গােল্লা করে তার মধ্যে ছেড়ে দিন। একটু ফুটলেই সেগুলাে শক্ত হয়ে যাবে। তার পর সেই মটরডালের টেনিস- বলগুলি ভেঙে তাতে কাঁচা সরষের তেল, নুন, কাঁচা লঙ্কা মেথে আবার গােল্লা পাকান। গরম ভাতে গাওয়া ঘি। তাই দিয়ে আর সব ভাতের সঙ্গে মটরডাল ভাতে। অমৃতের সঙ্গে তফাত নেই।

অঘ্রানের বা বলতে গেলে পুরাে শীতকালের আটপৌরে খাওয়াদাওয়াই আমাদের মচ্ছব ছিল। প্রতিটি দিন সকাল থেকে সন্ধে সুগন্ধে ভরপুর হয়ে রয়েছে চার দিক। সাধারণত রান্নার গন্ধ ভাল লাগে না। তাতে খিদে মরে যায়। কিন্তু, শীতের এই সব সবজির রান্নার গন্ধ এমনই পবিত্র যেন কোথাও দেবতার ভােগ রান্না হচ্ছে। ফুলকপিকে আলু-শিম দিযে চচ্চড়ি করুন, আলু বেগুন বড় বড় লম্বা লম্বা করে কেটে বড়ি বিন দিয়ে রুই-কাতলার ঝােল করুন জিরে ধনে আদা মরিচ দিয়ে। কিংবা ডুমাে ডুমাে আলু মটরশুটি ভাল করে কষে গরম মশলার নিরামিষ বা ভেটকি মাছ দিয়ে কালিয়া, শুকনাে শুকনাে ঘন্টও করা যায়। পিঁয়াজকলির চচ্চড়িতে কুচো চিংড়ি তাে অবশ্যই পড়বে। বাঁধাকপিরও ঘন্ট করুন, বড়ি ভেজে গুঁড়িয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে ওপরে। একটু চেপে চেপে দিতে হবে। পালং শাকের ঘণ্ট বা মুলােঘণ্টতেও তাই। সঞ্জীব কপূরের মতাে করে বলি, বড়ি ভেজে গুঁড়িয়ে ওপর থেকে ছড়িয়ে, তিন-চারটি কাঁচা লঙ্কা পুঁতে টেবিলে দিন। শােভা হবে। সবেতেই মটরশুটিরা জেগে থাকবে। প্রতি গ্রাসে মটরশুটি। তবে না মজা! পালং শাকের বড় বড় পাতা আর একটু মটরশুটি কড়াতে হালকা আঁচে চাপিয়ে দিন। সামান্য নুন, পাঁচ মিনিটেই রেডি। কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা তেল দিয়ে একটু একটু সবজে ঝােল সমেত সেই শাক, যেমন উপাদেয়, তেমনই স্বাস্থ্যকর।


শীতের স্পেশাল মাছ বলতে গলদা চিংড়ি, আর ভেড়ির ভেটকি। তার যে কত রকম পদ হয়, সে আমার চেয়ে আমবাঙালি রাঁধিয়ে খাইয়েরা বেশি জানেন। তবে, শীতকালে পার্সে, ট্যাংরা, কই, মাগুর ইত্যাদি মাছেরও মরশুম। সন্ধে পার হতেই বেগুন সেঁকা বা পােড়ার গন্ধ, ফুলকপি কষার গন্ধ ছড়িয়ে যাবে চার দিকে। রান্না হয়ে গেলেই খেয়ে নেওয়ার নিয়ম| গরম গরম৷ কার পড়া শেষ হয়নি, কার আজ্ঞা দিয়ে ফিরতে দেরি হবে, হেঁশেল সে সব শুনবে না। যেখানেই যাও, যা-ই করাে, সাড়ে আটটার মধ্যে ফিরে, এসাে বােসাে আহারে—হেঁশেলের ছুটি করে দাও।


শীতের সকালগুলাে ঝাপসা। লেপ ছাড়তে ইচ্ছে করে না। সেই ভােরবেলায় ঘুমভাঙা গলায় ফিরিওলা ডেকে উঠবে, ‘ছােলার চাক, মুড়ির চাক, চিড়ের চা– ক'। লেপ ছেড়ে লাফিয়ে উঠলুম ছােটরা। দৌড়ে গিয়ে চাকওলাকে ক্যাঁক করে ধরতে হবে। যার যে চাক পছন্দ, সে সেটা স্বহস্তে খরিদ করবে চাকটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি, যাকে মােয়া বলে জানি সে শীতকালের ভাের-সকালে কেন চাক হয়ে যায়, ভেবে কূল পাই না। তবে, মােয়ার জন্যেও চিন্তা নেই। একটু পরেই, রােদ উঠলেই হাঁক উঠবে— এএএজয়নগরের মােওযাঁ। সবটাই আনুনাসিক। মােযাওলা বিশেষ সম্রান্ত। তার বড় ঝুড়িতে মাের হাঁড়ি ছাড়াও আছে কলসিতে কলসিতে নলেন গুড় এবং শালপাতার আড়ালে পাটালি । কিন্তু, গুণী লােক তাে তাঁর সব গুণের কথা হেঁকে হেঁকে বলতে যান না! তাঁর এহেন ঝুড়িটি নামিয়ে দিতে কাউকে চাই৷ তুলতেও তাই। মােয়ার সৌজন্যে এই জয়নগরীরা প্রভূত বিদ্বান গুণী-জ্ঞানীদের নাম জানে। পরে এক মােয়াওলার দেখা পেযেছিলুম, যার মােয়া কিনতে অস্বীকার করলে সে ইউনিভার্সিটির অমলেন্দুবাবুর দিব্যি গালে। এ সব মােযা নাকি তাঁরই অর্ডারি। বিন্নি ধানের খই আর উৎকৃষ্ট এক নম্বরের নলেন গুড় না হলে হযই না। তার সঙ্গে কিসমিস, বাদাম, পেস্তা গজগজ করছে। সেই অর্ডারি মােয়া কয়েকখানা পড়ে আছে। তা-ও কি নেব না? স্যুট-পরিহিত অমলেন্দুস্যরকে এক হাতে এডমাণ্ড চসার, অন্য হাতে জয়নগরের মােয়া কল্পনা করে বিশেষ আনন্দ পাই। মােগুলি কিনেই ফেলি। কিন্তু, এক কামড় দিয়েই বুঝে ফেলি, আর যা-ই হােক, এ মােয়া সে মােয়া কথনওই নয়। যাই হােক, তখন আমাদের পুরাে এক কলসি নলেন গুড়, অন্তত খান দুই তিন পাটালি, আধ হাঁড়ি মােযা গছিয়ে দিয়ে হালকা হয়ে মােযাওলা চলে যেত— এএএজয়নগরের মােয়া...।


একদম শীতের গােড়ায়, নিঝুম দুপুরে তখন আর একটা ডাক উঠত, ‘
ছােলার শাক, ছােলার শাক’ কিংবা ‘ ছােলা ঘাস, ছােলা ঘাস, ছােট ছােট। বেশির ভাগ দিনই তাকে ধরতে পারতুম না। তার যেন বিক্রির কোনও গরজই নেই! শাঁ শাঁ করে হেঁটে চলে যাবে। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার ধরনধারন| ব্যাপারটা হল সবুজ গাছসুদ্ধ কাঁচা ছােলা। গাছকে শাক বলাটা ছােটবেলার কানে অবাক লাগত। তার চেযেও অবাক ‘ঘাস’ ‘ছােলাঘাস’ কী রে বাবা! যাই হােক, জলজ্যান্ত গাছ থেকে কাঁচা সবুজ ছােলা খুঁটে খুঁটে খাওয়ার মজাই আলাদা। কিছু এমন মহামহােপাধ্যায় খাদ্য নয় যে, আজকালকার শহুরে ছেলেমেয়েরা পেল না বলে মন খারাপ করতে হবে| আসল হল খাদ্যটা নয়, খাওয়ার মজা। আখের কথাটাই ধরুন ৷ খােলা দাঁত দিয়ে উপড়ে চিবিযে আখের রস খাওয়ারই কি কম মজা!


অঘ্রানের এক শুভ দিনে বড়িহাত করতেন মা। আমরা দারুণ উত্তেজিত, উৎসাহিত। রাত্তিরবেলা বিউলির ডাল ভিজবে। সকালে ননীবালা সেই ডাল বাটবে। এই উপলক্ষে ননীর একটি কাপড় (পুরনাে) ব্লাউজ ও পেটিকোট লাভ হবে। কেননা, কাচা জামা-কাপড় পরে না বাটলে বড়ি খারাপ হয়ে যাবে। বাটা ডাল কাঁসার ঝকঝকে গামলায় ফেটাবেন মা ফটাফট করে। হিং, একটু খাওয়ার সােডা, ব্যস। ফেটিয়ে ফেটিযে ডালটা ফুলে ডবল। এ বার গামলা, নতুন কুলাে, নতুন কাপড়ের টুকরাে, তেল-মাখানাে থালা, সব নিয়ে ছাদে উঠবেন মা৷ ধান- দুব্বো- সিঁদুর রেকাবিতে নিযে। শাঁখ হাতে আমরা পেছন পেছন৷ আগের দিন ছাদ ঝেটিয়ে ধুয়ে দুরস্ত করে রাখা হয়েছে। রােদ লুটোপুটি খাচ্ছে। কোণে কোণে ছােটরা নিযুক্ত পাখি তাড়াতে। কুলাের ওপর কাপড় বিছিয়ে পাঁচ আঙুলের কায়দায় টুম্বুস করে পর পর দুটি ডালের দলা পড়বে, তার ওপর দিকটা ছুঁচলাে করে দিলেন মা৷ তাদের ওই উঁচু নাকে ধান-দুব্বো, একটির ওপর সামান্য সিঁদুরও পড়ল। এঁরা হলেন বুড়ােবুড়ি। বিশেষ অতিথি। এর পর টপাটপ বড়ি পড়বে কুলাের কাপড়ে, থালায়। আর তাদের নাক টেনে টেনে লম্বা করা হবে। ক্রমে ক্রমে হবে পেঁপে বড়ি, কুমড়াে বড়ি, মুলাে বড়ি, কপি বড়ি। মানে, সামান্য পেঁপে বা ছাঁচি কুমড়াে, মুলাে বা কপি কুরে বড়ির ডালে মিশিয়ে দেওয়া হবে। অপূর্ব স্বাদ এদের। আজকাল আর পাওয়া যায় না। এ ছাড়াও আছে মুসুরের গােলাপি বড়ি, পােস্ত বড়ি, তিল বড়ি, গয়না বড়ি। গয়না বড়ি আবার দেওয়া নেওয়া হবে।


সারা শীত জুড়ে সকালবেলার ঝকঝকে রােদুরে মালিকদের শিসের সঙ্গে পারার দল উড়বে৷ ফাইটার প্লেনের মতাে তাদের নানা রকম ফর্মেশন৷ এ দিক থেকে এক দল উড়ল তাে, ও দিক থেকে আর এক দল| অনেক উঁচুতে চিল। হঠাৎ ঝুপ করে নেমে আসবে। এই যাঃ! দলছুট শেষ পায়রাটাকে নথে বিঁধিয়ে নিয়ে পাশের বাড়ির চিলেকুঠরির ছাতে নামছে। রােমশ গােদা পা, যেন মােজা পরে আছে। চোথে কী ক্রুর দৃষ্টি! ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে। ছিঃ! আমরা আর সিনে নেই। সব প্লি প্লা। মানে, পালিয়ে গেছি।


‘পউষপ্রখর শীতে জর্জর ঝিল্লিমুখর রাতি। সেই পউষের প্রধান পরব হল কিন্তু পরীক্ষা। তার পর বড় দিন। আর, তার পর মকর সংক্রান্তির পিঠে পার্বণ। এক একটা পরীক্ষা শেষ। আর সেই বিষয়ের বইগুলাে থাবা করে এক পাশে সরিয়ে রাখি। তাই নিশ্চিন্তে যিশুর জন্মদিন চলে আসে। তার সঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে আলাের বাহার। সেন্ট পল্‌সের বিরাট বেথলেহেম স্টার। ক্রিসমাস ট্রি, সান্তা ক্লজ এবং কেক পেষ্ট্রি। পঁচিশে ডিসেম্বর থেকে পয়লা জানুয়ারি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন প্রােগ্রাম। তার পরেই কনকনে তুষার-শীতল উত্তরে হাওয়াটি শনশনিয়ে এসে পড়বে। মকর সংক্রান্তি। সারা ভারত থেকে মানুষেরা ঝেটিয়ে যাচ্ছে গঙ্গাসাগর, আর আমাদের গৃহে গৃহে বাউনি বাঁধা হচ্ছে। বাউনি অর্থাৎ বামনি অর্থাৎ লক্ষীঠাকরুন। যিনি নাকি বড়ই চঞ্চলা। তাই বেঁধে রাখতে হয়। রান্নাঘর, ভাঁড়ারঘর ঝাড়া পোঁছা হবে। নতুন হাঁড়িতে নতুন চাল, ওপরে হলুদ, রুপাের টাকা ধান রেখে সরা চাপা দিয়ে দেওয়া হল। এ বার পাকা ধানের শিষ বিনুনি করে দড়ি হল। সেই দড়ির বাঁধন পড়ল হাঁড়ির গলায়। আরও দড়ি দরজার আংটায় লাগানাে হল। প্রথম পিঠে করে তাও হাঁড়িতে রেথে বাউনি বাঁধা হল| সংক্রান্তি কেটে গেলে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হবে। ইতিমধ্যে বাড়িতে বাড়িতে বাউনি বাঁধার, শঙ্খধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেছে পিঠেপর্ব। নারকোল- খেজুর গুড়ের ছাঁই তৈরি হবে৷ তার পুর দিয়ে হবে সেদ্ধ পুলি। বৈশাখী শিবের মতন তার গড়ন। হবে মুগের ডালের মুগসামলি। সরু চাকলির ভেতর ক্ষীরের পুর দিয়ে পাটিসাপটা। রাঙালুর পিঠে, রসবড়া, মালপাে, খাজা। কড়াইশুটির পুর দিয়ে আলুর নােনতা পিঠে, মটরশুটির কচুরি। সেদ্ধ পুলি নলেন গুড় দিয়ে খেতে হ্য| সরু চাকলিও তাই। এক বার আমাদের এক রাঁধুনি মাসি আটার সঙ্গে খেজুর গুড় মিশিয়ে একটা গােলা তৈরি করে স্রেফ গােল গােল করে ভেজে আমাদের অবাক করে দিয়েছিল। দারুণ খেতে। নাম গুড় পিঠে। এর সঙ্গে অবশ্যই হত নতুন গুড়ের পায়েস।